আজ ২৭শে অক্টোবর, বিশ্ব অকুপেশনাল থেরাপি দিবস ২০২৬। প্রতি বছরের মতো এবারও বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় “Participation Matters” অর্থাৎ অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৬ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো শারীরিক, মানসিক বা স্নায়বিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেঁচে আছেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার লড়াইয়ে যে চিকিৎসা পদ্ধতিটি সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে, তা হলো ‘অকুপেশনাল থেরাপি’।
সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রায়শই একটি বিভ্রান্তি দেখা যায় যে, ‘অকুপেশনাল থেরাপি’ বোধহয় কেবল পেশাভিত্তিক কোনো পরামর্শ। আসলে তা নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘অকুপেশন’ বলতে মানুষের প্রতিদিনের করণীয় সব কাজকে বোঝায়—যেমন সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করা, নিজের পোশাক নিজে পরা, খাবার খাওয়া, পড়াশোনা করা, কিংবা কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করা। কোনো ব্যক্তি যখন রোগ, আঘাত, বয়সজনিত কারণ বা জন্মগত ত্রুটির কারণে তার এই প্রাত্যহিক স্বাভাবিক কাজগুলো স্বাধীনভাবে করতে পারেন না, তখন তাকে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও কার্যকরী অনুশীলনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তোলার আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিই হলো অকুপেশনাল থেরাপি।
আমাদের সমাজে অকুপেশনাল থেরাপির পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু (যেমন—অটিজম, ডাউন সিন্ড্রোম, সেরিব্রাল পালসি, এবং এডিএইচডি) থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রবীণরা এই সেবার আওতাভুক্ত। একজন স্ট্রোক আক্রান্ত রোগী যখন তার শরীরের এক পাশ নাড়াতে পারেন না, কিংবা সড়ক দুর্ঘটনায় মেরুদণ্ডে আঘাতপ্রাপ্ত (স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি) কোনো ব্যক্তি যখন বিছানা থেকে উঠতে পারেন না, তখন একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট তার পাশে এসে দাঁড়ান। থেরাপিস্ট রোগীর শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা মূল্যায়নের পাশাপাশি তার ঘরের পরিবেশ ও কাজের জায়গা সংস্কারের (Environmental Adaptation) মাধ্যমে তাকে যতটুকু সম্ভব অন্যের সাহায্য ছাড়া বাঁচার পথ দেখান।
বর্তমান ব্যস্ত ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে মানসিক অবসাদ, তীব্র হতাশা ও ডিমেনশিয়ার মতো রোগ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। অকুপেশনাল থেরাপি শুধুমাত্র শারীরিক সুস্থতা নয়, বরং মানসিক ট্রমা বা বিষণ্নতায় ভোগা ব্যক্তিদের দৈনন্দিন রুটিন পুনর্গঠন ও সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে দারুণ কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এছাড়া, বার্ধক্যজনিত কারণে যারা কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন, তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতেও থেরাপিস্টদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বাংলাদেশে বিগত বছরগুলোর তুলনায় অকুপেশনাল থেরাপির সচেতনতা বাড়লেও দেশের বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় দক্ষ থেরাপিস্টের সংখ্যা এখনও খুবই অপ্রতুল। রাজধানী ও বড় বড় শহরগুলোর বাইরে গ্রামীণ পর্যায়ে এই সেবা পৌঁছানো এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে অকুপেশনাল থেরাপিস্টের পদ সৃষ্টি করা এবং তৃণমূল পর্যায়ে এই পুনর্বাসন সেবা ছড়িয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
প্রতিবন্ধকতা কিংবা অসুস্থতা জীবনের শেষ কথা নয়। সঠিক সময়ে সঠিক পুনর্বাসন চিকিৎসা পেলে একজন মানুষ সমাজের বোঝা না হয়ে সম্পদে পরিণত হতে পারে। বিশ্ব অকুপেশনাল থেরাপি দিবসের মূল লক্ষ্যই হলো—কাউকে পেছনে ফেলে না রেখে সবার জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা। আসুন, এই বিশেষ দিবসে আমরা সবাই অকুপেশনাল থেরাপির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হই এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন অধিকার নিশ্চিত করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করি।
লেখক-
ডা. এস. আহাম্মদ, ওটি
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগ
ময়মনসিংহ কলেজ অব ফিজিওথেরাপি এণ্ড হেলথ সায়েন্সেস (এমসিপিএইচএস) ও বেলা রিহ্যাবিলিটেশন হাসপাতাল, ময়মনসিংহ।
