ব্যর্থ জীবনের উপাখ্যান:
আমার কাছে জীবন মানে- কিছু করে বেঁচে থাকা| আর সেই বেঁচে থাকার সময়টুকুতে
কেউ হয় সফল আবার কেউবা হয় ব্যর্থ, কিন্তু আসলেই কি কোনো জীবন ব্যর্থ হয়?
আমার কাছে কোনো জীবনই ব্যর্থ না, কারণ জীবনকে আমি সফলতার মাপকাঠিতে
মাপিনা| আসলে জীবন এক অমূল্য সম্পদ, যাকে ভালো কোনো কাজে লাগানোই
জীবনের মূল সার্থকতা বলে মনে করি| তবুও আমরা বলি আমার জীবন ব্যর্থ, বা তার
জীবন সফল| আমার দৃষ্টিকোণে হয়তো জীবনের ব্যর্থতা এমন হতে পারে যে, নিজের
প্রত্যাশা ও বাস্তবের অমিল থেকে তৈরি হওয়া এক অবস্থা, এবং এটি একটি যাত্রার গল্প,
যেখানে প্রতিটি ভুল সিদ্ধান্ত, প্রিয়জনের হারিয়ে যাওয়া, এবং লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া
একটি ভারী গ্লানির জন্ম দেয়| সেজন্য জীবনকে সঠিকভাবে চালিত করা খুবই জরুরী,
নচেৎ ব্যর্থ জীবনের গ্লানিতে হতাশা বেড়ে যেতে পারে, এবং তখনই জীবনের মূল্যবোধ
নিজের কাছ থেকে হারিয়ে যায়| আমি ব্যর্থ জীবনের কল্পকথা খুঁজতে গিয়ে নিচের
বিষয়গুলো বিভিন্ন মাধ্যম হতে খুঁজে পেয়েছি, যা পাঠকদের জন্য তোলে ধরা হলো, যা একটি কাল্পনিক কিন্তু অনেকের জীবনের সাথে
হয়তো মিলেও যেতে পারে|
গল্পের শুরু: ¯^প্নের উড্ডয়ন
প্রত্যেকটি জীবন শুরু হয় একরাশ ¯^প্ন আর আকাশছোঁয়া সম্ভাবনা নিয়ে| ছোটবেলায় যদি কেউ জিজ্ঞেস করতো- “বড় হয়ে কী হবি?”
তখন এক গাল ভরা উত্তর থাকত| স্কুলের বারান্দায় বন্ধুদের সাথে কাটানো সোনালী দিন, পরীক্ষার আগে রাত জেগে পড়ার উত্তেজনা,
আর বাবা-মায়ের চোখে তখন উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখার ¯^প্ন- সব মিলিয়ে জীবনটা তখন এক বিশাল ক্যানভাসের মতো মনে হতো|
বাস্তবের মুখোমুখি: প্রথম হোঁচট
কিন্তু বয়সের সাথে সাথে ক্যানভাসের রঙগুলো ম্লান হতে শুরু করে| কৈশোর পেরিয়ে যখন তারুণ্যে পা দেয়া হয়, তখন বুঝা যায়
জীবন কেবলই পরিকল্পনা আর ¯^প্নের যোগফল নয়| বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যুদ্ধে, কিংবা কর্মজীবনের প্রথম ধাপে হোঁচট খাওয়া| প্রিয়
বিষয় বা ¯^প্নের চাকরিটা হাতছাড়া হয়ে যাওয়া| নিজের যোগ্যতার চেয়ে কম কিছুর সাথে আপোস করে নেয়া| সেই শুরু, এরপর
থেকে প্রতিটি পদক্ষেপেই যেন ভুল সিদ্ধান্তছাঁয়া হয়ে থাকা|
ভুল সম্পর্ক ও একাকীত্ব
জীবনের কোনো এক কঠিন সময়ে যাদের পাশে থাকার কথা ছিল, তাদের অনেকেই ¯^ার্থের টানে দূরে সরে যায়| আবেগের বশবর্তী
হয়ে কিছু ভুল সম্পর্কে জড়ানো, যা থেকে শুধু শূন্যতা আর মানসিক অশান্তিছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়না| একাকীত্ব তখন
এমনভাবে গ্রাস করে যে, নিজের অতি চেনা মানুষকেও অচেনা মনে হয়| চারপাশের সফল মানুষদের কোলাহলের মাঝে নিজেকে তখন
এক নীরব দ্বীপের বাসিন্দা মনে হয়|
পেশাগত ব্যর্থতা ও গ্লানি
কর্মজীবনে এসেও ব্যর্থতার চাকা ঘুরতে থাকা| যে কাজটা মন থেকে করতে চাওয়া হয়, কিন্তু ব্যর্থতার চাকায় পিষ্ট হয়ে বাধ্য হয়ে
এমন একটি পেশা বেছে নেয়া হয়, যা কেবলই জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়| দিনের পর দিন একই ঘানি টানা, কোনো
সৃজনশীলতা না থাকা, আর নিজের ভেতরের সত্ত্বাকে মেরে ফেলা- সব মিলিয়ে জীবনটা এক যন্ত্রে পরিণত হওয়া| আর্থিক টানাপোড়েন
আর ক্যারিয়ারের স্থবিরতা তখন আত্মবিশ্বাসকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে, আর শুরু হয় হতাশা|
আত্মোপলব্ধি: জীবনের আসল অর্থ
আজ আয়নায় নিজের দিকে তাকালে এক ক্লান্ত, বিধ্বস্তও পরাজিত মানুষকে দেখা যায়| যৌবনের সেই তেজ আর চোখে আলো আজ
আর নেই| কিন্তু এই দীর্ঘ ব্যর্থতার পথ পাড়ি দিতে দিতে এমন কিছু সত্য উপলব্ধি করা হয়, যা হয়তো সাফল্যের আলোয় কখনো
বোঝা যায়না|
তখন বুঝতে পারা যায়, ব্যর্থতা মানে জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়| বরং এটি জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক| হয়তো সমাজ বা দুনিয়ার
চোখে ব্যর্থ, কিন্তু নিজের কাছে কেউ পরাজিত নয়| হেরে গিয়েও টিকে থাকা, প্রতিটি ধাক্কা খেয়ে আবার উঠে দাঁড়াতে পারা, এটাই
জীবনের সার্থকতা| জীবনটা কোনো রেস বা প্রতিযোগিতা নয়, বরং প্রতিটি দিন বেঁচে থাকাটাই একটা বড় জয়|
লেখক
ডা. এম এ কুদ্দুস (জাহিদ), পিটি
সহকারী অধ্যাপক ও কোঅর্ডিনেটর
ময়মনসিংহ কলেজ অব ফিজিওথেরাপি এণ্ড হেলথ সায়েন্সে
